অর্গানিক শুঁটকির হালচাল - Khaasfood Blog
Cart
অর্গানিক খাদ্য

অর্গানিক শুঁটকির হালচাল

 

অনেক দিন পর বন্ধু আরিফের বাসায় গেলো মাহমুদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একই হলে ছিলো এক সময় দুজনে। মাহমুদ সরকারি চাকুরি করলেও আরিফ বেছে নিয়েছিলো কর্পোরেট জব। এতদিন যাবত ফোনে কথা হলেও দুজনের সময়ই মিলছিলো না একসাথে হওয়ার। কারণ মাহমুদের জব পোস্টিং কক্সবাজারে আরিফের অফিস ঢাকাতে। সরকারি কাজে ঢাকায় আসা লাগলো মাহমুদের। তাই বন্ধুর বাসায়ও একবার ঢু মারা আর কি।

বন্ধুর বাসায় আসার সময় কক্সবাজারের শুঁটকি নিয়ে আসলো। মাহমুদ বলছে এটার বিশেষত্ব আছে একটা। এই শুঁটকিকে বলা হয় অর্গানিক শুঁটকি। এই নাম শুনে তো আরিফের চোখ ছানাবড়া। শুঁটকি তো শুঁটকিই সেটি আবার অর্গানিক কিভাবে হয়। মাহমুদ হেসে বললো “শুঁটকি খেতে খেতেই না হয় এই গল্পটা বলবো। আগে তো খেতে দে।”

রাতে লইট্যা শুঁটকির ভর্তা, মলা মাছের শুঁটকি ভুনা, আর লাক্ষা শুঁটকিও রান্না করা হলো। খেতে খেতে মাহমুদ আরিফকে জিজ্ঞেস করলো “কোনো পরিবর্তন পাচ্ছিস কি?”

আরিফ বললো “ হা, লবন নেই। আর সচরাচর শুঁটকি থেকে যে ঘ্রাণ পাই সেটা পাচ্ছি না। এছাড়াও স্বাদও মনে হচ্ছে বেশ ভালো। এরকম পার্থক্যটা কিভাবে হলো?

মাহমুদ এবার বলতে থাকলো “ অর্গানিক শুঁটকি তৈরি করাটা বেশ কষ্টসাধ্য এবং পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু তাও বেশ কিছু মানুষ কাজটা করে যাচ্ছেন আমাদের জন্য। তুই তো জানিস শুঁটকি খাওয়া কতটা উপকার। 

শুঁটকি মাছে তাজা মাছের তুলনায় আমিষ, প্রোটিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ অনেক বেশি। ক্যালসিয়াম ও লৌহের পরিমাণও অনেক। ছোট চিংড়ির শুঁটকিতে লৌহের পরিমাণ বেশি। রক্ত স্বল্পতা ও গর্ভবতী নারীরা এটি খেলে উপকারই পাবেন। যাঁরা দুধ খেতে পারেন না বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে, তাঁরা প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসেবে মাঝে মাঝে শুঁটকি খেতে পারেন।

শুঁটকি মাছে তাজা মাছের তুলনায় আমিষ, প্রোটিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ অনেক বেশি। ক্যালসিয়াম ও লৌহের পরিমাণও অনেক। ছোট চিংড়ির শুঁটকিতে লৌহের পরিমাণ বেশি। রক্ত স্বল্পতা ও গর্ভবতী নারীরা এটি খেলে উপকারই পাবেন। যাঁরা দুধ খেতে পারেন না বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে, তাঁরা প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসেবে মাঝে মাঝে শুঁটকি খেতে পারেন।

বাড়ন্ত শিশুদের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্য শুঁটকি হতে পারে খুবই ভালো একটি উৎস। তবে শিশুদের জন্য শুঁটকি রান্নার ধরন হতে হবে আলাদা। বড়দের চাইতে ছোট শিশুদের প্রোটিনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ থাকে। আর প্রোটিনের অভাব হলে শিশুর গ্রোথ বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাড়তি চাহিদা পূরণে শিশুদের শুঁটকি দেয়া যেতে পারে। নিয়মিত শুঁটকি খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত শুঁটকি খেয়ে অভ্যস্ত তাদের সহজে জ্বর, সর্দি হয় না। শুঁটকিতে আয়োডিনের মাত্রা বেশি থাকায় বিভিন্ন ধরনের হরমোনাল সমস্যা দূর করতে এবং দেহে রক্ত বাড়াতে সাহায্য করে।” একটানা শুঁটকির গুণাগুণ বলতে থাকলো মাহমুদ। পকেটে থাকা একটি চার্ট বের করলো সে। দেখালো শুঁটকির পুষ্টিগুণ কেমন।

প্রতি ১০০ গ্রাম শুঁটকিতে কি পরিমাণ আমিষ, প্রোটিন ও খনিজ লবণ রয়েছে?

ছোট চিংড়ির শুঁটকি: ৬২ দশমিক ৪ গ্রাম প্রোটিন, ৩৫৩৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩৫৪ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২৮ গ্রাম লৌহ ও ২৯২ ক্যালরি।

ছুরি শুঁটকি: ৭৬ দশমিক ১ গ্রাম প্রোটিন, ৭৩৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭০০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৪ দশমিক ২ মিলিগ্রাম লৌহ, ৩৮৩ ক্যালরি।

টেংরার শুঁটকি: ৫৪ দশমিক ৯ গ্রাম প্রোটিন, ৮৪৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪০০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৫ মিলিগ্রাম লৌহ ও ২৫৫ ক্যালরি।

লইট্টার শুঁটকি: ৬১ দশমিক ৭ গ্রাম প্রোটিন, ১৭৮১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২৪০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২০ মিলিগ্রাম লৌহ ও ২৯৫ ক্যালরি।

ফাইস্যা মাছের শুঁটকি: ১১ গ্রাম প্রোটিন, ১১৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪৭৮ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ১৮ মিলিগ্রাম লৌহ ও ৩৩৬ ক্যালরি।

অর্গানিক শুঁটকি তৈরি করার প্রসেসটাও বেশ মজার। 

সাগরে মাছ ধরার ট্রলার বা নৌকা বা জাহাজ মোটা দাগে দু ধরণের। বোট আর ট্রলিং। অর্গানিক শুঁটকির জন্য ব্যবহৃত হয় বোট। এই বোট থাকে সাগরে ৭-১০ দিন। এই সময়ে ধৃত মাছগুলো সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয় বরফ। বেশি দিন সমুদ্রে না থাকার কারণে অ্যামোনিয়া গ্যাস দেওয়ারও প্রয়োজন হয় না। এই মাছের স্বাদ যেমন সবচেয়ে ভাল তেমনি কিনতেও খরচ করতে হয় কিছুটা বেশি। মাছ সংগ্রহের পর সেগুলো ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়। এর পর সকাল সকাল কাটা হয় এবং সাথে সাথেই পরিষ্কার পানি দিয়ে ধোয়া হয়। তা না হলে মাছি ডিম পাড়তে পারে, ডিম থেকে পোকা আসে এবং পোকা মাছ খেয়ে ফেলতে পারে।

এরপরে তা ড্রাইং সেকশনে পাঠানো হয়। এখানে যে ঘর গুলোতে মাছ শুকানো হয় এগুলোকে একদিক থেকে আমরা ‘গ্রিন হাউজ’ বলতে পারি। ‘ফিস ড্রায়ার’ দিয়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে এই শুঁটকি শুকানো হয়, ফলে ফাইবার পচে না এবং কোন রূপ দূ্র্গন্ধ হয় না। স্বচ্ছ সেলুলয়েড এবং নেট দ্বারা ড্রায়ার আবৃত থাকায় মাছি ও পোকামাকড় প্রবেশ করতে পারে না। 

ফ্লোর লেভেলে থেকে ৬ ইঞ্চি উচ্চতায় এটা তৈরি করতে ব্যবহৃত হয় স্টিল, স্টিলের শিট, কাঠ। এছাড়া স্কিন পেপার ব্যবহৃত হয়েছে যেন সূর্যের আলো আসতে পারে, চাইনিজ স্পেশাল নেট ব্যবহৃত হয় যেন মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ফ্যান দেয়া হয় বাতাস ফ্লো করার জন্য। এছাড়া হিট কন্ট্রোলার আছে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, ৩২ ডিগ্রি থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রাখা হয়। হিউমিডিটি মিটার ব্যবহৃত হয় আর্দ্রতা চেক করার জন্য, এখানে ১৭-২২ শতাংশ রাখা হয়।

এই প্রসেসিং করার ফলে শুঁটকি খাওয়া হয় সম্পূর্ণ নিরাপদ। আর শুঁটকির যে প্রোটিন তাও আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই হলো তোমার প্লেটের শুঁটকির বিশেষত্ব।”

মাহমুদের কথা শুনে আরিফ হা করে তাকিয়ে রইলো। বাহ, তাইলে তো সামনে থেকে অর্গানিক শুঁটকিই খেতে হয়।