শীতের সুস্থতায় খাদ্যাভ্যাসঃ কিছু জরুরি তথ্যাদি! - Khaasfood Blog
Cart
শীতের আয়োজন

শীতের সুস্থতায় খাদ্যাভ্যাসঃ কিছু জরুরি তথ্যাদি!

নভেম্বর থেকেই শুরু হয় শীতের জাঁকিয়ে পড়া। ইতোমধ্যেই শৈত্যপ্রবাহ কয়েকবার কাবু করেছে আমাদেরকে। তাই প্রতিনিয়ত দরকার পড়ছে শরীরকে ভেতর থেকে গরম রাখার। শীত উপভোগ করতে, শরীর গরম করতে এবং শরীর সুস্থ রাখার জন্য খাদ্যতালিকায় রাখা চাই পুষ্টিকর খাবার। বিশেষজ্ঞদের মতে আমাদের শরীরের সচলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে যথাযথ জ্বালানী সরবরাহের উপর। ঠিক ঠিক জ্বালানি দিতে না পারলে শরীরের ভিতর শীতটাও বেশি চেপে বসবে। 

আমরা যা খাই তাই হতে পারে আমাদের শরীর গরম করার জ্বালানী। আর এই জন্য  খাওয়া-দাওয়া হওয়া প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট। পাশাপাশি দরকার পর্যাপ্ত ঘুম। শীতকাল ভোজনরসিকদের জন্যও আদর্শ সময়। শীতের কিছু খাবার রয়েছে, যেগুলো খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শীতের খাবার গুলো নিয়েই পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য হুজুর।

 

পানি

শরীর ভেতর থেকে সুস্থ থাকলেই ত্বক উজ্জ্বল রাখা সম্ভব। শীতের শুরু ও শেষের সময়ে ডিহাইড্রেশনের সমস্যা দেখা দেয়। কারণ, শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে আমাদের পানি পান করা কমে যায়। শীত বাড়লেও আমাদের পানি পান করা যেন কমে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যারা ঠাণ্ডা পানি খেতে পারেন না তারা হালকা কুসুম গরমপানি খেতে পারেন। পানির স্বাদ বাড়াতে বেলের গুঁড়া মিশাতে পারেন।  শীতে চুল পড়া বেড়ে যায়, চুলে খুশকি হয়। চুলের যত্নে প্রয়োজনীয় পানি পান করুন। মাঝে মাঝে ডাবের পানি, পেঁপে বা কলার রসও পান করতে পারেন। সারাদিনে তিনবেলার খাবারের মেন্যুতে রাখতে পারেন গরম দুধ, লিকার চা, তিন-চার ফোঁটা লেবুর রস। এটি পানির সঙ্গে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও কাজ করবে। শীতে শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।

স্যুপ

শীতে শরীর সুস্থ রাখতে স্যুপ বা ঝোল দারুণ উপকারী। শীতেই মেলে স্যুপের আসল মজা। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় গরম-গরম চুমুক। শীতের বিকেলে বা রাতের খাবারে ধোঁয়া ওঠা এক বাটি স্যুপ হলে কিন্তু মন্দ হয় না। এতে শরীর থেকে একটু হলেও কাটবে ঠাণ্ডার রেশ। শরীর সুস্থ রাখতে শীতের সময় নানা সবজি আর নিরাপদ মুরগির মাংস বা নিরাপদ ডিম দিয়ে বানিয়ে খেতে পারেন স্যুপ।

পালংশাক

শীতে বাজারে পালংশাক প্রচুর পাবেন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও শীতে সুস্থ থাকতে পালংশাক খেতে পারেন। পুষ্টিতে ভরপুর এই শাকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ক্যানসার প্রতিরোধী গুণের কারণে এটি “সুপারফুড” হিসেবে পরিচিত। সবুজ পাতার এ শাক দ্রুত পেটের চর্বি কমাতে পারে। পালংয়ে ভিটামিন ও মিনারেল আছে, এতে ক্যালরি থাকে কম। তাই ওজন কমাতে খাবারে বেশি করে পালংশাক রাখতে পারেন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যাদের ওজন বেশি, তারা নিয়মিত পালংশাক খেলে বাড়তি ওজন কমে যায়।

টক ফল

শরীরে ফাইবার বা আঁশের ঘাটতি মেটাতে ও ভিটামিন সি এর যোগান দিতে শীতের সময় বেশি করে টকজাতীয় ফল খেতে পারেন। কমলা, বরই, পেয়ারা হতে পারে ভিটামিন সি এর দারুণ উৎস। পেয়ারায় অধিক পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে, যা অনেক বেশি প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এতে আরো থাকে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম। 

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পুষ্টি ও পথ্যবিদ শামছুন্নাহার নাহিদের তথ্য অনুযায়ী, বরইয়ে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ আছে নানা পুষ্টি উপাদান। এসব উপাদান দেহের  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।  সিজনাল ফল হওয়ায় সেগুলোকে আঁচার হিসেবেও খেতে পারেন। 

ডিম

ডিমের মধ্যে রয়েছে নয়টি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিড। এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও আয়রন। এটি বিভিন্ন সংক্রমণ  প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। ডিমে রয়েছে বিভিন্ন ভিটামিন, যেমন—বি২, বি১২, এ ও ই; রয়েছে জিংক, ফসফরাস এবং প্রয়োজনীয় মিনারেল। শীতের খাবার হিসেবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় তাই ডিম রাখতে পারেন। শুধু শীত নয়, সারা বছরই ডিম আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিন্তু ভালো মানের ডিম না খাওয়ার কারণে সেই উপকার থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি প্রতিনিয়ত। ডিমের সমস্ত উপকারীতা পাওয়ার জন্য খান অর্গানিক  এবং সেইফ এগস। 

আদা

শীতকালে আদার চা না হলে কী হয়? সকালে এক কাপ রঙ চা আদাসহ খাওয়াটা যেন এক পরম পাওয়া! অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ আদা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে। এটি শরীরের রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন ধরনের ফ্লু প্রতিরোধে কাজ করে। প্রতিদিন সকালে শীতের খাবার হিসেবে তাই আদা রাখুন।

কাঠবাদাম

কাঠবাদাম অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর একটি খাবার। এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিকেলের সঙ্গে লড়াই করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই শীতের খাবার হিসেবে এর কদর বেশ। শরীরে শক্তি উৎপন্ন করে শরীরকে গরম রাখতেও সহায়তা করে এ খাবারটি।  

মাশরুম

মাশরুম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। শীতে ঠান্ডা ও ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে মাশরুম খুব উপকারী। তাই শীতের খাবার হিসেবে আপনার খাদ্যতালিকায় অবশ্যই মাশরুম রাখুন! সবজি হিসেবে মাশরুম না খেতে পারলে কিনতে পারেন মাশুরমের গুঁড়া। রান্নায় ব্যবহার করে স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি পুষ্টিও জমাতে পারেন দেহে। 

রসুন

জ্বর ও ঠাণ্ডার জাতীয় রোগব্যাধির জন্য রসুন খাওয়া ভালো। রসুন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে কাঁচা রসুন সবচেয়ে ভালো কাজ করে। তবে হজমে সমস্যা হলে রসুন রান্না করেও খেতে পারেন। শীতের সময় তাই রসুন সেবন করুন। তবে কাঁচা রসুন খাওয়া অনেকের জন্য সহ্য নাও হতে পারে। তাই রসুনের আঁচার হতে পারে আপনার জন্য পারফেক্ট কম্বিনেশন। 

মধু

জ্বর ও ঠাণ্ডা প্রতিরোধে মধু সবচেয়ে নিরাপদ খাবার। শীতের খাবার হিসেবে তো মধুর কোন জুড়িই নেই। মধুর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান। এটি ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে। ঘুমানোর আগে বা সকালের নাশতার সাথে মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। ভালো হয় এক গ্লাস হালকা গরম দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে। মধু শুধু শীতকালে নয়, সারাবছরই আমাদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ভেজালের যুগে খাঁটি মধু পাওয়া দুষ্কর। সবচেয়ে ভালো হয় নিজেই সংগ্রহ করে মধু খেতে পারলে। 

হরেকরকম সবজি

শীতকাল মানেই হরেকরকম সবজির সমাহার। শীতের খাবার হিসেবে প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় সবুজ পাতার সবজি রাখুন। এতে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও ‘কে’ থাকে। এছাড়া হালকা হলুদ ও ফ্যাকাসে সবুজ পাতা বা শাকে প্রচুর ফলেট থাকে, যা গর্ভবতী মা ও বাড়ন্ত শিশুদের জন্য অনেক ভালো। শীতের সবজিতে আরো রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা পলিস্যাকারাইড নামের শর্করা। সাধারণত হালকা সিদ্ধ সবজিতে পরিপূর্ণ পুষ্টি পাওয়া যায়। তবে সবজি সিদ্ধ করে পানি ফেলে দেওয়া যাবে না। রান্নার সময় চেষ্টা করতে হবে যেন সবজির রং নষ্ট না হয়। এই সবুজ রঙের সবজির মধ্যে আছে পুঁইশাক, বাঁধাকপি, পাটশাক, পালংশাক ইত্যাদি।

গ্রিন টি

গ্রিন টির মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান। শীতেরদিনে দুই থেকে তিন কাপ গ্রিন টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে। মাঝে মাঝে শরীরে অনেক ঠাণ্ডা অনুভব করলে এক কাপ গ্রিনটির সাহায্য নিতেই পারেন। 

এই খাবার গুলো শীতে আপনাকে যেমন শরীর গরম করে তুলতে সাহায্য করবে, তেমনি শীতকালীন বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধও করায় সহায়তা করবে। শীতে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো আমরা অলস হয়ে যাই। খাবার বা পানীয়ের ক্ষেত্রে অলসতা প্রকাশ করি। পরিপূর্ণভাবে সুস্থ থাকার জন্য সঠিক খাবার গ্রহণের বিকল্প নেই।