রমজানে শরীর চাঙ্গা রাখবে যে শরবত - Khaasfood Blog
Cart
রেসিপি

রমজানে শরীর চাঙ্গা রাখবে যে শরবত

পবিত্র সিয়াম সাধনার এ রমজান মাস এবার ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দীর্ঘদিনের সময়ে পড়েছে। তাছাড়া রোজা এবার গরমের মৌসুমে। ফলে সারাদিনের রোজায় ক্লান্ত হয়ে পড়বেন প্রায় সকলেই। প্রচণ্ড এ গরমে রোজা রাখার পর সারা দিনের ক্লান্তি কাটাতে ইফতারে চাই এমন কিছু, যা তেষ্টা মেটাবে এবং দূর করবে ক্লান্তি। এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত সারা দিনের ক্লান্তি মুছে শরীরকে চাঙা করতেই শুধু ভূমিকা রাখে না, একই সঙ্গে অবসাদ ঘুচিয়ে দিতেও বেশ কার্যকরী। তাই ইফতারে সবার চাই স্বাস্থ্যকর এক গ্লাস শরবত। 

রৌদ্রতপ্ত দিনের পানির চাহিদা মিটানোর জন্য প্রয়োজন অনেক বেশি পানি পান করা। কিন্তু অনেকেরই পানি বেশি খাবার অভ্যাস নেই। আবার বারবার পানি খেতে একঘেয়েমি লেগে যায়। এ ক্ষেত্রে পুষ্টিগুণের পাশাপাশি শরীরের পানির স্বল্পতা দূর করতে শরবতের জুড়ি মেলা ভার। বাজার এখন মৌসুমী ফলে ভরপুর। এসব ফল দিয়েই বানিয়ে ফেলতে পারেন ঠান্ডা মজাদার শরবত। বাজার থেকে এনে পরিষ্কার ও জীবানুমুক্ত করে ফেলুন আপনার পছন্দের ফল এবং রমজানের পুরো মাসজুড়ে সতেজ থাকতে একেক দিন বেছে নিতে পারেন পছন্দের একেকটি শরবত। কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াই এসব শরবত আপনার ও আপনার পরিবারকে করবে প্রাণবন্ত। সেই সাথে তাজা ফলের তৈরি শরবতের পুষ্টিগুন আপনাকে করবে সতেজ ও সুন্দর। 

তাই চলুন চটপট কিছু সহজ, সুস্বাদু শরবত তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ, প্রস্তুত প্রনালী ও উপকারিতা দেখে নেয়া যাক। 

১. পুদিনার শরবত

উপকরণঃ

পুদিনা পাতা বাটা ২ চা চামচ, লেবুর রস ২ টেবিল চামচ, চিনি ২ টেবিল চামচ, ১ চিমটি বিট লবন, স্বাদমতো লবন এবং পানি ১ গ্লাস।

প্রণালিঃ

প্রথমে পুদিনা পাতা ধুয়ে ব্লেন্ড করে নিন। এবার পানির সঙ্গে পুদিনা পাতা বাটা, চিনি ভালো করে মিশিয়ে ছেঁকে নিন। চিনিতে সমস্যা হলে এর পরিবর্তে অন্য কিছু ব্যবহার করতে পারেন বা চিনি বাদ দিয়ে লবণ ও ১ চিমটি বিটলবণ মিশিয়ে নিন। সবার শেষে লেবুর রস দিয়ে দিন।

উপকারিতাঃ

এ শরবত পানে অনেক বেশি সতেজ অনুভত হয়। পুদিনাপাতা ও লেবুর রসের মিশ্রণ শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরনের সাথে সাথে পেটের যে কোনও সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করে খুব দ্রুত। 

২. দুধ তোকমার শরবত

উপকরণঃ

তোকমার দানা ১ টেবিল চামচ, চিনি ১ টেবিল চামচ, বরফকুচি ২ টেবিল চামচ এবং রুহ-আফজা ১/২ চা চামচ।

প্রণালিঃ

প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে নিন। শরবত বানানোর আধাঘণ্টা আগে তোকমার দানা ১/২ গ্লাস খাবার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। ভিজিয়ে রাখা তোকমার দানা ঠান্ডা দুধে মিশিয়ে নিন। চিনি ও রুহ-আফজা দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। বরফকুচি মিশিয়ে ভালো করে ঝাঁকিয়ে নিন। ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।

উপকারিতাঃ

এ গরমে দেহের তাপ কমাতে এ শরবত বিশেষ সহায়ক। শুধু ইফতার নয়, সেহেরিতেও খেতে পারেন কারণ এতে রয়েছে প্রচুর আঁশ, যা বাড়তি ক্ষুধা দূর করে এবং পেট দীর্ঘক্ষণ পরিপূর্ণ থাকার অনুভূতি দেয়। দেহের ওজন কমাতে এ বীজের জুড়ি নেই। তোকমার ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড দেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এ ছাড়া এর নানা উপাদান দেহের চর্বি কমাতে সহায়তা করে। তাই এ রমজানে প্রতিদিনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হতে পারে এ শরবতটি।

৩. আদা লেবুর শরবত

উপকরণঃ

আদার রস ১ চা চামচ, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, চিনি ২ টেবিল চামচ, ঠাণ্ডা পানি ১ গ্লাস।

প্রস্তুত প্রণালীঃ

সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে শরবত বানাতে হবে। ইফতারের সময় এই শরবত খুবই ভালো লাগবে।

উপকারিতাঃ

দীর্ঘ সময় রোজা রাখার ফলে হাতে-পায়ের বা শরীরের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে এ শরবত। এ ছাড়া ক্যানসার, বমি বমি ভাব, রক্তচাপ কমাতেও বিশেষ উপকারী আদা লেবুর শরবত। ইফতারে ভাজাপোড়া খাবার বেশি খাওয়া হয়। তাই লেবুতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চর্বি কমাতে সাহায্য করবে আশা করা যায়।

৪. শসার শরবত

উপকরণঃ

শসা ২৫০ গ্রাম, ধনেপাতা কুচি আধা টেবিল চামচ, বিট লবণ সামান্য, চিনি সামান্য, কাঁচা মরিচ ১টি এবং পানি সামান্য।

প্রস্তুত প্রণালীঃ

শসার খোসা ছাড়িয়ে এবং বীজ ফেলে কুচি করে নিন। এরপর সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে ব্লেন্ড করে নিতে হবে। এবার সুদৃশ্য একটা শরবতের গ্লাসে বরফ কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন মজাদার শসার শরবত।

উপকারিতাঃ

স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের বিশেষ পছন্দের এ শরবত শুধু আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো তাই নয়, এটি দেহের ক্যান্সার প্রতিরোধ করার শক্তি বৃদ্ধি করে। ইফতারে এ শরবত দেহের পানি শূন্যতা দূরের পাশাপাশি দেহের বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে। যাদের হজমের সমস্যা আছে, তারা অবশ্যই এ শরবত পান করে দেখতে পারেন। আশা রাখি উপকার পাবেন। 

৫. আমের শরবত

উপকরণঃ

কাঁচা আম কুচি এককাপ, চিনি স্বাদমতো, পানি আধাকাপ, বিট লবণ এক চিমটি, পরিমাণমতো বরফ কুচি।

প্রস্তুত প্রণালীঃ

আম ভালোভাবে ধুয়ে কেটে টুকরো করে নিন। এবার ব্লেন্ডারে একে একে আম, পরিমানমতো বিট লবন, কাচামরিচ, চিনি ও পানি দিন। সবকিছু একসাথে ভালোকরে ব্লেন্ড করুন ২ মিনিট। হয়ে গেলো দারুন স্বাদের কাঁচা আমের শরবত। গ্লাসে ঢেলে বরফ টুকরো দিয়ে পরিবেশন করুন।

উপকারিতাঃ

গরমের প্রধান প্রশান্তি বলা চলে আমকে। প্রচন্ড সুস্বাদু আমের শরবত ইফতারে পান করলে এক নিমিষে জুড়িয়ে যাবে আপনার মনপ্রাণ। ফাইবার সমৃদ্ধ এ ফল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষ সহায়ক। ভিটামিন-সি যুক্ত হওয়ায় ঠান্ডাজনিত রোগ নিরাময়ে উপকারী। অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রণে সাহায্যকারী এ শরবত পানে শরীর নানাবিধ সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে আশা করা যায়।

৬. তরমুজের শরবত

উপকরণঃ

তরমুজ কুচি দুইকাপ, চিনি ২ টেবিল চামচ, বিট লবণ আধা চা চামচ, লেবুর রস ২ চা চামচ, বরফ কুচি।

প্রস্তুত প্রণালীঃ

তরমুজ কুচিসহ সব উপকরণ মিশিয়ে ব্লেন্ড করে ফ্রিজে রেখে দিন। প্রয়োজনীয় ঠাণ্ডা হলে নামিয়ে এনে পরিবেশন করুন রঙিন এক গ্লাস ঠাণ্ডা তরমুজ শরবত।

উপকারিতাঃ

দেখতে সুন্দর, স্বাদে ভরপুর এ শরবত ইফতারে আপনাকে দেবে বিশেষ প্রশান্তি। গরমে প্রাণ জুড়াতে তরমুজের শরবতের জুড়ি নেই। সুস্বাদু এ শরবত কিডনি সুস্থ রাখার পাশাপাশি রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। তরমুজের শরবত অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া প্রোস্টেট ক্যানসার, কোলন ক্যানসার ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

৭. আনারসের শরবত

উপকরণঃ

আনারস কুচি ১ কাপ, বিট লবণ আধা চা চামচ, চিনি ২ চা চামচ, গোলমরিচের গুঁড়া ২ চা চামচ, পানি পরিমাণমতো।

প্রস্তুত প্রণালীঃ

আনারস কুচির সঙ্গে বিট লবণ, চিনি, গোল মরিচের গুঁড়া ও পানি একসঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে ব্লেন্ড করে নিন। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল আনারসের শরবত। এবার সুন্দর একটি গ্লাসে ঢেলে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

উপকারিতাঃ

আনারসের শরবত খুব পুষ্টিকর একটি পানীয়। অত্যাধিক পরিমাণে ভিটামিন সি ও ফাইবার থাকায় এটি ত্বকের জন্য খুব উপকারী। ইফতারিতে অনায়াসে খেতে পারেন এ শরবত, কারণ খালি পেটে এ শরবত কৃমি নিবারনে সাহায্যকারী। আনারসে আছে উচ্চ মাত্রায় পানিতে দ্রবণীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন-সি এবং পানিতে দ্রবণীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা দেহকে ফ্রি-রেডিকেল থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। ফলে ক্যান্সার এবং হৃদরোগের মত মারাত্মক রোগ শরীরে বাসা বাঁধতে পারে না।

৮. জামের শরবত

উপকরণঃ

জাম ১ কাপ, পানি ১ কাপ, চিনি ১ টেবিল চামচ, লেবুর রস ১ চা চামচ, অর্ধেক কাঁচামরিচ, পুদিনাপাতা কুচি, পরিমান মতো লবণ।

প্রস্তুত প্রণালীঃ

জাম বীচি থেকে আলাদা করুন। এবার অন্যান্য সব উপকরণ আর জাম একসঙ্গে ব্লেন্ড করে নিন। চাইলে ছেঁকে নিন অথবা না ছেঁকে নিলেও হবে। ফ্রিজে রেখে দিন ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য। ঠাণ্ডা হলে ইফতারে পরিবেশন করুন।

উপকারিতাঃ

সারাদিনের কর্মব্যস্ত শরীরকে নিমিষেই তরতাজা করতে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে জামের শরবত। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য অত্যন্ত উপকারী এ শরবত ইফতারে শুধু তৃষ্ণা মেটাবে না, মেটাবে প্রয়োজনীয় নানান পুষ্টির চাহিদা। 

৯. তেঁতুলের শরবত

উপকরণঃ

তেঁতুল, বিট লবণ, চিনি, কাঁচা মরিচ কুচি, ধনিয়া পাতা কুচি, শুকনা মরিচের গুড়া, ঠাণ্ডা পানি।

প্রস্তুত প্রণালীঃ

প্রথমে তেঁতুল থেকে বিচি আলাদা করে একটি পাত্রে তেঁতুল গুলে নিন। গোলানো তেঁতুলের সঙ্গে পরিমানমতো ঠাণ্ডা পানি মিশান। এবার তেঁতুলের সঙ্গে একে একে পরিমানমতো চিনি, বিট লবণ, টেলে রাখা শুকনা মরিচের গুড়া, কাঁচা মরিচ কুচি ও ধনিয়া পাতা কুচি দিন এবং নেড়ে ১০ মিনিট রাখুন। তেঁতুলের মিশ্রনটি অন্য একটি পাত্রে ছাকনি দিয়ে ছেকে নিন। গ্লাসে ঢেলে বরফ কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন।

উপকারিতাঃ

গরমে তেঁতুলের শরবত দেবে অতুলনীয় প্রশান্তি। তেঁতুল রক্তের কোলস্টেরল কমায়। তাই এ রমজানে পেটে গ্যাস হলে তেঁতুলের শরবত অনেকটা সাহায্য করবে। তেঁতুলে থাকা ভিটামিন-মিনারেলস স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ উপকারী।

১০. পুদিনা পেস্তার লাচ্ছি

উপকরণঃ

মিষ্টি দই ১ কাপ, পুদিনা ২ টে. চামচ, পেস্তা বাদাম ১ টে. চামচ, কাঁচামরিচ ১ টা, চিনি ২ টে. চামচ এবং বরফ ১০-১২ টুকরো।

প্রণালিঃ

প্রথমে মিষ্টি দই, পুদিনা, পেস্তা বাদাম, চিনি, কাঁচামরিচ ও বরফের টুকরোগুলো ব্লেন্ডারে নিয়ে খুব ভালো করে ব্লেন্ড করে নিয়ে, পছন্দের গ্লাসে ঢেলে উপরে পুদিনা ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।

উপকারিতাঃ

অনেক সুস্বাদু এ শরবত এ গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করবে। পুদিনা পাতায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট পেটের যেকোনও সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করে। এছাড়াও এ শরবত নিমিষেই শরীরকে চাঙ্গা করবে। দই ও পেস্তা বাদাম শরীরে জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

শরবত ছাড়া ইফতারে তৃষ্ণা মেটানো দায়। সারাদিনের গরমে রোজাদার ব্যক্তির কাহিল দেহ যখন তৃষ্ণায় জর্জরিত, তখন এক গ্লাস ঠান্ডা ফলের শরবত পুরো শরীরে দেয় এক শান্তির ছোঁয়া। পানির চাহিদা পূরনে সহায়ক, ফলের শরবতের উপকারী খাদ্য গুনাবলি শরীরের ক্ষয় পূরনেও বিশেষ উপকারী। সুস্থ দেহে ইবাদতের মাধ্যমে আমরা এ পবিত্র মাসে আমাদের সব গুনাহ মাফে তৎপর হই। নিজেকে সুস্থ রাখি এবং আশেপাশের নিম্ন আয়ের মানুষকে যথাসাধ্য সাহায্য করি। পবিত্র রমজান মাসকে সকলের জন্য সুন্দর করার চেষ্টা করি। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের সকলের সহায় হোন। আমিন 😇